ফেলুদার গোয়েন্দাগিরির ব্যাপার স্যাপার

ইদানীং ফেলুদাকে নিয়ে বেশ কয়েকটা, নয় নয় করে পাঁচ-পাঁচটা গল্প উপন্যাস নতুন করে (পুনরায়) পড়া হয়ে গেল। তার ওপরে বেশ কয়েকটা ফিল্ম, আর ফেলুদাকে নিয়ে অনেকগুলো সোস্যাল মিডিয়া সাইটে আলোচনা আর শার্লক হোমসের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে দেখলাম। তার ওপর সম্প্রতি মারিয়া পোপোভার শার্লক হোমসের ওপর লেখা কি করে শার্লক হোমসের মতন করে ভাবতে হয় বইটা বার দুয়েক পড়ার পরে ভাবিয়েছে যে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরির কায়দা নিয়ে দু কলম লিখি। এর অবিশ্যি অন্য একটা কারণও আছে। ফেলুদার গল্প গুলো পড়তে গিয়ে বেশ বুঝছি যে নিজের জীবনে, যাই করি না কেন, ওর গোয়েন্দাগিরির রকম সকম বুঝে তাকে দিব্যি কাজে লাগানো যায়। ইদানীং ফেলুদাকে নিয়ে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের একটি ওয়েব সিরিজ শুরু হয়েছে। সিরিজটি মন্দ হয়নি, কিন্তু সেখানে কতটা সত্যজিৎ রায় কৃত ফেলুদাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, কেন জানি মনে হচ্ছে না। কিন্তু এভাবে বললে তো সবটা বলা হয় না। কারণ ফেলুদা নিজেই তোপসেকে বলে “কি জানি কেন” না বলে ভাবতে কেন জানি না তার একটা বিশ্লেষণ করতে।

ফেলুদার গোয়েন্দাগিরির কতগুলো প্যাটার্ণ আছে। সেগুলো একে একে লিখে ফেলা যাক:

ফেলুদার সর্বপ্রধান বিশেষত্ব, সে যা পর্যবেক্ষণ করে, ভারি খুঁটিয়ে দেখে। খুঁটিয়ে বলতে বোঝাতে চাইছি যে সে প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানিপুঙ্খ বিচার বিবেচনা করে। কিন্তু এর মধ্যে একটা সিস্টেম আছে। এই দেখাটা হয়ত তার চোখের পলকে হয়, কিন্তু এর পেছনের চিন্তাভাবনাটা ধীরে সুস্থে, ফলে ফেলুদার খুঁটিনাটি দর্শণটা একটা নিয়ম মেনে হয়। একটা উদাহরণ দিই: বোম্বাইয়ের বোম্বেটে গল্পে ফেলুদা লালমোহনবাবুকে বলছে সান্যালকে কেমন দেখতে তার বর্ণনা দিতে। লালমোহনবাবু শুরু করছেন সান্যাল কতটা লম্বা তাই দিয়ে এবং যথারীতি খেই হারিয়ে ফেলেছেন। ফেলুদা লালমোহনবাবুকে কিছুটা ধমকের সুরে বলছে মানুষকে যে দেখছেন কি সে কতটা লম্বা সেই হিসেবে? তার মুখের বর্ণনা দিন। এই ব্যাপারটা থেকে একটা বিষয় বোঝা যায় যে ফেলুদা মানুষকে মনে রাখেন বা রাখতে বলেন তার মুখ, অন্যান্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে, এমন কিছু নয় যেটা সার্বজনীন (যেমন কতটা ভারি, বা কতটা লম্বা সে, যদিনা সেটা দারুণ রকম মনে রাখার মতন কিছু হয়)।

গ্যাংটকে গণ্ডগোল উপন্যাসে তোপসে লিখছে ফেলুদা একবার একজনকে দেখলেই তাকে মনে রাখেন এবং নিমেষের মধ্যে। কাউকে নিমেষের মধ্যে মনে রাখতে গেলে তার আপাত মস্তক দেখলে চলবে না। কিছু বিশেষত্বের দিকেই কেবল নজর রাখতে হবে। যেমন এরোপ্লেনে তাদের পাশে যে লোকটি বসে সে যে বাঙালী তাকে মনে রেখেছেন তার আঙুলে “মা” ইনস্ক্রিপশনে আংটি পরা দেখে (এই ব্যাপারটা পরে গল্পে একটা ভূমিকা নেবে)। এই যে সিস্টেমেটিকালি, কোন কোন বৈশিষ্ট্য নজর করব, এটাকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কানিমান system 2 বা slow চিন্তা বলেন। এই চিন্তাটি ধীরেসুস্থে করতে হয়, চটজলদি যা মাথায় এল তাকেই স্থির বলে ধরে রাখলাম এরকম ব্যাপার নয়। ফেলুদা এটা পারে কারণ সে শুধু দেখে না, যা দেখে তার একটা দেখার কারণ থাকে তার। সে যা দেখে তাকে কোথাও না কোথাও নথিবদ্ধ করে রাখে।

দ্বিতীয়ত, ফেলুদার নোটস। ফেলুদা যা দেখে সে কোথাও না কোথাও নথিবদ্ধ করে রেখে দেয়। হাতের কাছে খাতা না থাকলে সে মনে রাখে, নয় সে লিখে রাখে, তোপসেকে বলতে বলে, তোপসেকে সে বলে যায়। তাই বিভিন্ন গল্পে তাকে একটা নীল বা সবুজ নোট খাতায় সমস্ত বিষয় লিখে রাখতে দেখা যায়, তার বুক পকেটে পেনসিল থাকে, যাতে সে সবকিছু লিখে রাখে। সোনার কেল্লা গল্পে সে তোপসেকে বলছে সারা দিনে কার কার সঙ্গে দেখা হল তার একটা তালিকা তৈরী করতে।

এটা একটা লক্ষ্য করার ব্যাপার যে ফেলুদা শুধুই দেখে না, সে “নোট” করে। শার্লক হোমস বলতেন মাথার অ্যাটিক (কুলুঙ্গী) যেখানে তিনি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ঘটনাপঞ্জী রেখে দেন, যখন দরকার হয় তাকে তখন বের করেন। আমরা ফেলুদার নোট নেওয়া বা তার নীল কি সবুজ খাতা কেমন দেখতে জানি না, কিন্তু জানি যে সে নানা রকম নোট নেয়, সেগুলোকে সে তদন্তের সময় পড়ে, তাদের নিয়ে ভাবে। শুধু দেখলেই তো হবে না, সমস্ত দেখার একটা ব্যবহারিক উপযোগিতার ব্যাপার আছে। ফেলুদা কি নোট করে জানি না, কিন্তু জানি যে সে অন্তত একটা সময়সারণি অনুসরণ করে। কোন লোককে সে কখন দেখেছে, তার চেহারার বা আচরণের কি বিশেষত্ব, সে ব্যাপারগুলো তার চিন্তার জগতে থাকে। পরপর নোটগুলো নিতে থাকে বলে সে প্রশ্নগুলোও করতে থাকে।

তিন, চিন্তা। ফেলুদা চিন্তা করে। ফেলুদার চিন্তার কিছু শারীরিক বহিঃপ্রকাশ আছে। কখনো সে আঙুল মটকাতে থাকে, কখনো চারমিনার ধরিয়ে ধোঁওয়া ছাড়ে, কখনো সে হাঁটতে বেরোয়। এই চিন্তার ব্যাপারটায় দুটো ব্যাপার লেখার আছে।

এক নম্বর ব্যাপার, এই চিন্তার মধ্যে দিয়ে সে একটা “গল্প” তৈরী করে। এ গল্প কিন্তু আজগুবি কষ্টকল্পনার গল্প নয়, তার নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের বন্ধন আছে। সমস্ত ব্যাপার বা ঘটনা যেগুলো সে নজর করেছে সেগুলো যেন পরপর মিলে যায়। প্রতিটা ব্যাপার মেলাতে হবে, কিছু যেন বাদ না থেকে যায়। একটা ব্যাপারও না মিললে হবে না। কোথাও ধাঁধা থাকলে তাকে সে সমাধান করতে বসে সবার আগে। এই জায়গাটাতে ফেলুদার কল্পনাশক্তির প্রয়োগের একটা ব্যাপার আছে।

দুনম্বর ব্যাপার, ঘটনা সর্বপ্রথম (ঘটনা তার তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণ নির্ভর), তারপর “গল্প” তৈরীর পর সে তত্ত্ব সাজায়। এখানে সিকোয়েন্সটা লক্ষ করার মতন। এর উল্টোটা, মানে আগে গল্প পরে ঘটনা মেলানো, কখনো হবে না।

বোম্বাইয়ের বোম্বেটে গল্পে সে লালমোহনবাবুকে সাবধান করছে যে লালমোহনবাবু আগেভাগেই থিয়োরী কি অপরাধী সাব্যস্ত করে তারপর ঘটনা সাজান; ফেলুদার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। সে আগে সমস্ত ঘটনাকে সাজায়, তারপর ঘটনা থেকে তার থিয়োরী কি অপরাধীর তত্ত্ব বেরোয়। এবার সে তত্ত্ব একাধিক হতে পারে। সে একটার পর একটা তত্ত্বকে নাকচ করতে করতে এগোয়। ফেলুদার এই প্রক্রিয়াটি নিরন্তর হতে থাকে (কি তত্ত্ব সে নাকচ করেছে আমরা সে সব জানি না, অবিশ্যি নিজেরা ভেবে নিতে পারি)। তার মানে ফেলুদার চিন্তার ব্যাপারটা একটা কল্পনা, একটা গল্প তৈরীর ব্যাপার, তবে এই গল্পের গোড়ায় তার প্রবল পর্যবেক্ষণশক্তির একটা মস্ত অবদান আছে।

চার, পরবর্তী ছক। ঘটনাক্রমকে খুঁটিয়ে দেখে, সমস্ত কিছুকে নথিবদ্ধ করে, তাদের মধ্যে থেকে এক বা একাধিক তত্ত্ব সাজিয়ে সেখান থেকে ফেলুদা আরেকটা ব্যাপার করে, সেটা হল তার পরবর্তী ঘটনাক্রমের একটা আভাস তৈরী করা। এভাবে ব্যাপারটা বলা মনে হয় যথাযথ হল না। কখনো সে ফাঁদ পাতে, কখনো সে বোঝে যে কিছু একটা অনিষ্ট হতে চলেছে, সে রুখতে পারুক না পারুক, কখনো সে এক বা একাধিক মানুষের ওপরে নজর দেয়। শেয়াল দেবতা রহস্যে ফেলুদা দেওয়ালে হাতের ছাপ, নীলমণি বাবুর বাড়িতে “ভাগ্নের উপস্থিতি”, চাকরের তলপেটে সজোরে ঘুঁষি থেকে বামনের একটা থিয়োরি খাড়া করে (যদিও সে থিওরি আমরা গল্পের শেষে দেখতে পাই)। তার ভিত্তিতে সে নীলমণিবাবুর দিকে দিকনির্দেশ করে (যদিও গল্প পড়তে গিয়ে নীলমণি সান্যালের প্রতিদ্বন্দির দিকে পাঠকের সন্দেহ ঘনীভূত হবার কথা)।

পাঁচ। অবিশ্বাস ও যাচাই। ফেলুদা কোন ঘটনাকে কেবল অন্যের চোখে দেখে বা অন্যের মুখে শুনে তার ভিত্তিতে কাজ করতেন না, যতক্ষণ না তিনি নিজে সে বিষয়ে নিঃসংশয় হতেন।

এই যে ক্রমান্বয়ে পর্যবেক্ষণ, তথ্য লিপিবদ্ধ করে রাখা, তাকে বিশ্লেষণ, সেখান থেকে তত্ত্ব খাড়া করা, নতুন ঘটনার জন্য সক্রিয় অনুসন্ধান করা, এবং এই ব্যাপার বা কাজের প্রণালীকে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া (চিত্র ১),

এটা থেকে একটা ব্যাপার বেরিয়ে আসে যে ফেলুদার গল্পগুলোতে ফেলুদা যত না “গোয়েন্দা” তার থেকে বেশী সে যেন একজন প্রথামাফিক বৈজ্ঞানিক। তাই একজন বিজ্ঞানীর মতন তার পর্যবেক্ষণে কোন কিছু বাদ যায় না। তাকে নোট নিতে হয়। সে তাই অপরাধীর মনস্তত্ত্ব কি alibi কি motive নিয়ে যত না নাড়াচাড়া করে, তার থেকে ঢের বেশী সে অপরাধীর ফেলে যাওয়া সূত্রগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া করে। সেখান থেকে সে কেস সাজায়।

এই হল ফেলুদার মগজাস্ত্রের ছ’টা কার্ট্রিজ:

১) সে অবিশ্বাসী ও সন্দিগ্ধ — চট করে কোন কথা বা কোন ঘটনাকে সে মেনে নেয় না, যতক্ষণ না সে নিজে থেকে সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহে জেনে বা উপলব্ধি করছে; সে কোন কিছুকে প্রথম দর্শণে দেখেই বা শুনেই ধারণা করে না।
২) সে স্মৃতিধর, প্রচুর পড়াশোনা করে — ফেলুদা প্রায়ই বলে যে গোয়েন্দাদের প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়। শুধু তাই নয়, সে যে বিষয় জানে না, তার জন্যে তাকে সিধু জেঠার শরণাপন্ন হতে হয়, এবং সে হয়ও। বিভিন্ন বিষয়ে তার আগ্রহ ও জ্ঞান, বিশেষ করে সে যা নিয়ে অনুসন্ধান করতে নেমেছে তার সম্বন্ধে তাকে সবকিছু যেন জানতেই হবে।
৩) ধুরন্ধর ইন্দ্রিয় ও সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে ফেলুদা — তার অসাধারণ পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা। তবে এও মানতে হবে সে খুব চিন্তাভাবনা করে দ্রুত যা দেখার তাকে দেখে। এই যুগপৎ দ্রুত ফোকাসড দেখে নেওয়া অথচ খুঁটিয়ে দেখাটা একটা দারুণ অস্ত্র
৪) ফেলুদা নোট নেয় — তার সবুজ আর নীল খাতায় সে সমস্ত কিছু লিখে রাখে। শুধু দেখা/শোনা/ঘ্রাণ গ্রহণ করা নয়, এ সমস্তের অতীত আরো কিছু। সে লেখায় প্রশ্ন থাকে, সংকেত থাকে। তোপসে বলে আঁকিবুকি কেটে রাখা, সব যে তোপসেও বোঝে তা নয়। তবুও এটা তাৎপর্যপূর্ণ
৫) ফেলুদা থিওরি সাজায় — এখানে তার প্রখর কল্পনাশক্তির খেলা। সে কিন্তু গল্প করে না, এতে কোন আজগুবি কিছু নয়, নিখাদ ঘটনাবলীকে নিয়ে সে তত্ত্ব খাড়া করে অনুসন্ধান করে। এখানে তার অদম্য উৎসাহ। কিভাবে চিন্তা করে সে?
৬) তত্ত্বের ভিত্তিতে ফেলুদা আবার দেখতে থাকে — কখনো সে ওত পেতে থাকে, কখনো সে আগে থেকে কি ঘটবে তার অনুমান করে এগোতে থাকে।

এখন এই যে এক থেকে ছয়, রিভলভারের কার্তুজের মতই সেগুলো ঘুরতে থাকে, একটা থেকে একটায়, এবং একসঙ্গে সেগুলো রহস্যের সমাধান করে। ফেলুদার গল্প পড়তে গেলে এই ব্যাপারগুলো মাথায় থাকলে সুবিধে হয়, তবে এই লেখাটাতে এগুলোকে আরেকটু বিশদে দেখে নিই।

হত্যাপুরী গল্পে রহস্য উন্মোচন হতে চলেছে, লালমোহন বাবুকে ফেলুদা বলছে, সন্দেহই তো গোয়েন্দার সবথেকে বড় কাজ, আপনার প্রখর রুদ্র করে না? লালমোহনবাবু আমতা আমতা করছেন। সন্দেহ আর অবিশ্বাস অবিশ্যি গোয়েন্দারাই কেবল করে না, ওটাই বিজ্ঞানের রীতি। বৈজ্ঞানিক সন্দেহ করতে না শিখলে বৈজ্ঞানিক হয়ে ওঠে না। সন্দেহের ইতিহাস মানুষের সভ্যতার ইতিহাস।

Associate Professor of Epidemiology and Environmental Health at the University of Canterbury, New Zealand. Also in: https://refind.com/arinbasu

Get the Medium app

A button that says 'Download on the App Store', and if clicked it will lead you to the iOS App store
A button that says 'Get it on, Google Play', and if clicked it will lead you to the Google Play store